মোঃ রায়হান হোসেন: ‘সেনাবাহিনীর গর্বিত পিতার সন্তান’ এই পরিচয়ের আড়ালে ক্ষমতার দম্ভ এবং লাগামহীন দুর্নীতির এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন আম্বরখানা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (আইসি) দ্বীন মোহাম্মদ। তার স্বেচ্ছাচারিতা, প্রকাশ্য চাঁদাবাজি এবং মানসিক নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন ফাঁড়িরই এক পুলিশ সদস্য।
অপকর্মের প্রতিবাদ করায় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে চাকরি ছাড়া ওই ভুক্তভোগী সদস্য জানিয়েছেন, আইসি দ্বীন মোহাম্মদের বিরুদ্ধে তার কাছে অডিও-ভিডিওসহ অসংখ্য সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে পুরো ফাঁড়ির থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করেন তিনি।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, আইসি দ্বীন মোহাম্মদের ইশারায় পুরো আম্বরখানা এলাকায় চলছে চাঁদাবাজির মহোৎসব। তার আয়ের অবৈধ উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে, দলদলি চা বাগানের মাদক কারবারি এবং অবৈধ ‘তীর খেলা’র আসর থেকে নিয়মিত সাপ্তাহিক চাঁদা আদায়।
যানবাহনে চাঁদাবাজির মধ্যে রয়েছে, রাতের আঁধারে গোয়াইনঘাট থেকে আসা সবজির গাড়ি থেকে ১ হাজার টাকা এবং ভারতীয় চোরাই পণ্য (জিরা, চকলেট) বহনকারী গাড়ি থেকে ৪ হাজার টাকা করে আদায়। এছাড়া অনটেস্ট সিএনজিগুলো থেকেও নিয়মিত মাসোহারা নেন তিনি ও আম্বরখানা পয়েন্টের হকারদের কাছ থেকে ‘ছাত্তার’ নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে দোকানপ্রতি ১৭০ টাকা করে তোলা হয়। এছাড়া এলাকার প্রতিটি হোটেল থেকে সাপ্তাহিক চাঁদা এবং লাক্কাতুরার মদের স্পট থেকেও মোটা অংকের মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
এই চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করতে আইসি ব্যবহার করছেন নিজস্ব দালাল ও সোর্স। ‘সাদ্দাম’ নামের এক চিহ্নিত সোর্স প্রকাশ্যে ফাঁড়ির ব্যারাকে দাপটের সঙ্গে চলাফেরা করে। চাঁদার টাকা লেনদেনের জন্য ফাঁড়ির সামনের ‘শরীফ’-এর দোকানের বিকাশ নম্বর ব্যবহার করা হয়। হকারদের চাঁদার টাকা ফাঁড়ির সামনের ফুজি স্টুডিওর সাব্বিরের কাছে জমা থাকে, যা পরে মুন্সি হানিফের মাধ্যমে আইসির পকেটে যায়। এছাড়া হকারদের ভ্যানগাড়ি আটকে সাব্বিরের মাধ্যমে ১ হাজার টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার অডিও-ভিডিও প্রমাণও ভুক্তভোগীর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
আইসি দ্বীন মোহাম্মদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অভিযানে আসামি ধরে এনে মোটা অংকের ঘুস বাণিজ্যের মাধ্যমে ম্যাজিস্ট্রেটকে ম্যানেজ করে নামমাত্র জরিমানায় তাদের ছাড়িয়ে আনেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও কেবল তার ছত্রচ্ছায়ায় ফাঁড়ির সামনে শরীফ ও কালা মিয়ার দোকান সারারাত খোলা থাকে।
পদত্যাগকারী পুলিশ সদস্য জানান, আইসির এসব অপকর্মের প্রতিবাদ করলে তিনি কোনো যুক্তিই মানতেন না, উল্টো নিজের একগুঁয়েমি চাপিয়ে দিতেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলায় আইসি দ্বীন মোহাম্মদ থানার ওসিকে ভুল বুঝিয়ে ওই সদস্যকে ফাঁড়ি থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করান। ন্যায়বিচার না পেয়ে এবং এমন দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশের সঙ্গে আপস করতে না পেরে অবশেষে নিজের ইচ্ছায় চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।
পদত্যাগকারী ওই সদস্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “আমার কাছে আইসি দ্বীন মোহাম্মদের সমস্ত অপকর্মের অডিও, ভিডিও এবং আসামির জবানবন্দির রেকর্ড সংরক্ষিত আছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি গোপনীয়ভাবে আম্বরখানা ফাঁড়িতে তদন্ত করে এবং অন্যান্য অফিসার ও কনস্টেবলদের জিজ্ঞাসাবাদ করে, তবে এই দুর্নীতিবাজ আইসির সব অপকর্মের সত্যতা প্রমাণিত হবে।”
তবে এসব বিষয়ে জানতে আইসি দ্বীন মোহাম্মদের ব্যবহৃত সেলফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি রিসিভ না করায় বক্তব্য মিলে নি।
এখন দেখার বিষয়, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এই ‘স্বঘোষিত ক্ষমতাধর’ ও দুর্নীতিবাজ আইসির বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে কি না, নাকি সর্ষের ভেতরের ভূত বহাল তবিয়তেই থেকে যাবে।
ধারাবাহিক পর্ব নং- ০১।